আমিনুল ইসলাম সাগরঃ
বরিশালের উজিরপুর উপজেলার জনতা বাজার সংলগ্ন পটিবাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ‘আত্মঘাতী ড্রেজার’ মেশিন ব্যবহার করে বালু উত্তোলন করে আসছেন স্থানীয় সাইফুল পাইক নামের এক ব্যক্তি। অবৈধভাবে এই বালু উত্তোলন কার্যক্রম একদিকে যেমন স্থানীয় পরিবেশ ও জনজীবনকে হুমকির মুখে ফেলেছে, তেমনি সরকারি বিধিনিষেধকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলছে প্রকাশ্যেই। এ বিষয়ে প্রশাসনের নিরবতা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।
স্থানীয়দের ভাষায়, এ ধরনের ড্রেজার মেশিনকে তারা বলেন "আত্মঘাতী"। কারণ, এটি দিয়ে বালু উত্তোলনের ফলে আশপাশের বসতভিটা, কৃষিজমি, রাস্তা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অতিরিক্ত কাটা বালির কারণে অনেক জমি দেবে যাচ্ছে, পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, এমনকি ভবিষ্যতে বাড়িঘর ধসের আশঙ্কাও করছেন স্থানীয়রা।
একজন কৃষক বলেন: “প্রতি রাতে গোঁ গোঁ শব্দে ঘুম আসে না। আমরা ভয়ে আছি—কখন যেন মাটির নিচে তলিয়ে যাই। এটা আত্মঘাতী না তো কী?”
এই ঘটনায় সম্প্রতি আলোচনায় উঠে এসেছেন হাবিবুর রহমান নামে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা। অভিযোগ উঠেছে, তিনি তার নিজস্ব জমি থেকে সাইফুল পাইকের সেই একই আত্মঘাতী ড্রেজার ব্যবহার করে বালু কেটে নিজের দালানের পাশে ভরাট কাজ করিয়েছেন।
এ বিষয়ে স্থানীয় একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন: “আমার জমি থেকে আমি বালু কাটাচ্ছি, এতে কার কী? সমস্যা থাকলে নিউজ করেই দাও।”
এই ধরণের প্রকাশ্য উক্তি এবং আইনের তোয়াক্কা না করায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এলাকাবাসী। অনেকে বলছেন, সাধারণ মানুষ কিছু করলে সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন আসে, অথচ প্রভাবশালী হলে যেন সব নিয়মই বদলে যায়।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত) অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়াও এটি নদী, খাল ও আশপাশের জমিতে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে একাধিকবার পরিবেশ অধিদপ্তর সতর্ক করেছে।
তবুও দিনের পর দিন এই কর্মকাণ্ড চলে যাচ্ছে প্রশাসনের চোখের সামনে দিয়ে। স্থানীয়রা বলছেন, অভিযোগ জানানো হলেও কেউ আসে না, ব্যবস্থা নেয় না।
একজন ভুক্তভোগী বলেন: “সাইফুল পাইককে সবাই চেনে, সে কত বড় লোক জানি না, কিন্তু তার ড্রেজার আমাদের জমি শেষ করে দিচ্ছে। প্রশাসনকে বললেও লাভ হয় না।”
এলাকাবাসী চাইছেন, অবিলম্বে এই আত্মঘাতী ড্রেজার মেশিনটি জব্দ করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাবিবুর রহমানের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত দাবি করেছেন তারা।
তাদের ভাষায়, “নিজের জমি মানে এই না যে আপনি যা খুশি তাই করবেন। এই ড্রেজার দিয়ে শুধু নিজের না, আশপাশের ১০ জনের ক্ষতি করছেন।”
উজিরপুরের জনতা বাজার সংলগ্ন এই পটিবাড়িতে ‘আত্মঘাতী ড্রেজার’-এর মাধ্যমে অবৈধ বালু উত্তোলন এখন শুধু স্থানীয় সমস্যা নয় — এটি এক ভয়ংকর পরিবেশ বিপর্যয়ের দিকেই যাচ্ছে। প্রশাসনের নিরবতা, প্রভাবশালী চক্রের দাপট এবং সাধারণ মানুষের অসহায়তা মিলে গড়ে উঠেছে এক গভীর সংকট।
প্রশাসনের কাছে প্রশ্ন রইল—এবার কি তবে সত্যিই ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
[সংবাদ প্রতিবেদক]
তারিখ: ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
স্থান: উজিরপুর, বরিশাল