-
মোঃ কুতুব উদ্দিন
ঢাকা
*"মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি -মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই মন হারাবি "
*"সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন -সত্য সুপথ না চিনিলে মানুষের দর্শন "
বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে এমন ব্যক্তিত্ব খুব কমই আছেন, যাঁদের প্রভাব সাহিত্য, সংগীত, দর্শন, সমাজচিন্তা এবং লোকঐতিহ্যের ওপর একযোগে বিস্তৃত হয়েছে। লালন সাঁই সেই বিরল ব্যতিক্রম। তিনি কেবল একজন ফকির কবি নন; তিনি ছিলেন এক দার্শনিক, এক সাংস্কৃতিক বিপ্লবী এবং প্রচলিত সামাজিক পরিচয়ের বিরুদ্ধে এক নীরব বিদ্রোহ।
কিন্তু একটি গভীর বিদ্রূপ হলো—যে মানুষটি সারাজীবন পরিচয়ের সংকীর্ণতা ভাঙতে চেয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকেই ঘিরে তৈরি হয়েছে মালিকানার নানা দাবি, সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের নানা কাঠামো এবং উত্তরাধিকার নিয়ে অসংখ্য বিতর্ক।
প্রশ্ন হলো: লালন কি কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি? লালনের সুর কি কোনো একক ব্যক্তি, পরিবার, আখড়া বা প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন? নাকি লালন এমন এক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যার প্রকৃত মালিক সমগ্র জনগণ?
লালনের ঐতিহাসিক অবস্থান:
গবেষক মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য এবং আবুল আহসান চৌধুরী-এর দীর্ঘ গবেষণাকর্মে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে আসে—লালনের গান মূলত মৌখিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে।
এই তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ---
কারণ মৌখিক ঐতিহ্যের প্রকৃতি লিখিত সাহিত্যের মতো নয়। একটি কবিতার নির্দিষ্ট মুদ্রিত পাঠ থাকতে পারে, কিন্তু লোকসংগীতের ক্ষেত্রে একই গান বিভিন্ন অঞ্চলে, বিভিন্ন শিষ্য-পরম্পরায়, এমনকি বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করতে পারে।
অতএব, "একমাত্র আমিই আসল সুর জানি"—এই দাবির পেছনে ইতিহাসের চেয়ে অহংকারের উপস্থিতি বেশি।
সুরের প্রশ্ন: আসল কোনটি?
লালনের গান নিয়ে সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত দাবি হলো—এটাই আসল সুর-
কিন্তু এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে।
কোন দলিলের ভিত্তিতে?
লালন কি তাঁর সমস্ত গানের স্বরলিপি তৈরি করে গিয়েছিলেন?আমাদের অতিরিক্ত অধিকার অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করা সর্বত্রই অপরাধ ।
কোনো প্রামাণ্য গ্রন্থ কি আছে, যেখানে তিনি নিজ হাতে লিখে গেছেন—"এই সুরই চূড়ান্ত"?
যদি না থাকে, তবে "চূড়ান্ত" শব্দটি কোথা থেকে এলো?
লোকসংগীতের ইতিহাসে সুর একটি প্রবহমান বিষয়। সুর পরিবর্তিত হয়, অভিযোজিত হয়, সময়ের সঙ্গে নতুন কণ্ঠে নতুন ব্যাখ্যা লাভ করে। এটাই লোকঐতিহ্যের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
ওয়ারিশ সূত্র খরিদ সূত্র -
এখানেই সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি।দায়িত্ব না পেয়ে নিজের মুখে প্রকাশ করা দায়িত্ব পেয়েছি অথবা আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে বিভিন্নভাবে ভুলভাল বুঝানো নানা মাধ্যমে প্রকাশ করা।
অনেকেই উত্তরাধিকার এবং মালিকানাকে এক করে ফেলেন।একজন শিল্পী চল্লিশ বছর লালনের গান গাইতে পারেন। তিনি সম্মানের দাবিদার।
একজন গবেষক পঞ্চাশ বছর লালন নিয়ে গবেষণা করতে পারেন। তিনি শ্রদ্ধার দাবিদার।
একটি আখড়া প্রজন্মের পর প্রজন্ম লালনের গান সংরক্ষণ করতে পারে। তাদের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই।
কিন্তু এই অবদানগুলোর কোনোটিই মালিকানার দলিল নয়।সংরক্ষণ আর মালিকানা এক জিনিস নয়।পরিবেশন আর সৃষ্টি এক জিনিস নয়।
উত্তরাধিকার আর একচেটিয়া কর্তৃত্ব এক জিনিস নয়।
কিছু প্রশ্ন:যাঁরা নিজেদেরকে লালনের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাঁদের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন রাখা প্রয়োজন।
প্রথমত, লালন কি আপনাকে তাঁর উত্তরাধিকার বিষয়ে কোনো লিখিত ক্ষমতা দিয়ে গিয়েছিলেন?
দ্বিতীয়ত, আপনার দাবি কি গবেষণালব্ধ তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে, নাকি জনপ্রিয়তার ওপর?
তৃতীয়ত, আপনার পূর্বপুরুষ বা প্রতিষ্ঠান বহুদিন ধরে লালনচর্চা করে থাকলেও, সেটি কীভাবে সমগ্র লালনধারার ওপর একচেটিয়া কর্তৃত্বের ভিত্তি হয়ে যায়?
চতুর্থত, যদি লালনের দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হয় মানবমুক্তি, তবে তাঁর নাম ব্যবহার করে সাংস্কৃতিক সীমান্তরেখা টানা কি সেই দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
পঞ্চমত, যে মানুষটি জাতপাত ভাঙার কথা বলেছেন, তাঁর উত্তরাধিকারে নতুন ধরনের সাংস্কৃতিক জাতপাত তৈরি করার অধিকার আপনাকে কে দিল?
লালন এবং অহংকারের সংকট-
লালনের গানে বারবার ফিরে আসে আত্ম-অনুসন্ধান, অহংকারবিরোধিতা এবং মানুষের প্রকৃত পরিচয়ের প্রশ্ন।
অথচ আজ তাঁর নামেই সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান যে প্রবণতা, তা হলো আত্মগৌরবের প্রদর্শন।
যেখানে লালন মানুষকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছেন, সেখানে আমরা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে ব্যস্ত।
যেখানে তিনি পরিচয়ের দেয়াল ভেঙেছেন, সেখানে আমরা নতুন দেয়াল নির্মাণ করছি।
যেখানে তিনি মানুষকে মুক্ত হতে বলেছেন, সেখানে আমরা তাঁকেই বন্দি করতে চাইছি ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান এবং গোষ্ঠীর সংকীর্ণ সীমানায়।
পরিশেষে:
লালনকে নিয়ে সবচেয়ে বড় সত্য সম্ভবত এই যে—তিনি কারও নন বলেই তিনি সবার।
তাঁকে নিজের বলে দাবি করা সহজ; তাঁর দর্শন ধারণ করা কঠিন।
তাঁর গানকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানানো সহজ; তাঁর মানবতাবাদকে জীবনে বাস্তবায়ন করা কঠিন।
তাঁর নাম ব্যবহার করে সাংস্কৃতিক ক্ষমতা অর্জন করা সহজ; তাঁর শেখানো বিনয় অর্জন করা কঠিন।
সুতরাং ইতিহাসের সামনে শেষ প্রশ্নটি থেকেই যায়—
যাঁরা লালনের মালিকানা দাবি করেন, তাঁরা কি সত্যিই লালনের উত্তরাধিকার বহন করছেন, নাকি কেবল লালনের নামের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করছেন?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে—আমরা লালনকে অনুসরণ করছি, নাকি কেবল তাঁকে ব্যবহার ব্যবহার করছি অধিকাংশ বেশধারী সাধু বাউল শিল্পী নাম ধরে ।
মূলত এই ফকির লালন কি বলেছেন কি করেছেন কি ছিল লালন ফকির ? কে কতটুকু কত টা ধারণ করতে পেরেছে তার বহিঃপ্রকাশ নেই একজন ফকির লালন নিয়ে নাম ফলাচ্ছে ব্যবসা করছে অধিকাংশ সাজা বাউল শিল্পী নামদারী গবেষক যাদের প্রকৃত কর্ম নেই লালনের ফকির সাইনবোর্ড ব্যানার পোস্টার বলার তাবিজ টুপি পৈতা পুথি সিঁদুর ঈশ্বরের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে ফকির লালন শাহ কে ।
যা উচিত নয় বিশ্ব জাতির।
লালন ফকির তিনি নিজেই প্রকাশ করে গেছেন তিনি কে কেন এসেছেন তার কর্ম সবকিছুই তিনি তার কালাম মাধ্যমে প্রকাশ করে গিয়েছেন।এর বাইরে আমাদের চিন্তা ভাবা অতিরঞ্জিত করা ভুল অপরাধ অথবা বোকামি ।