নিজস্ব প্রতিবেদক
অতিরিক্ত সচিব এস এম লাবলুর রহমান, যিনি বর্তমানে সিভিল এভিয়েশন অথরিটির (বেবিচক) সদস্য (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্বরত। তার বিরুদ্ধে পদ্ধতিগত দুর্নীতি, ক্ষমতার চরম অপব্যবহার এবং শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে দুর্নীতির এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।চলছে এখনও।
তার বিরুদ্ধে আনীত এই অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে নিয়োগ বাণিজ্য, স্বর্ণ চোরাচালান, অর্থ পাচার এবং নৈতিক স্খলনের মতো ভয়াবহ সব তথ্য।
লাবলুর রহমানের ক্ষমতার মূল উৎস ছিল তার মেজো বোন মনিরা পারভীনের রাজনৈতিক প্রভাব, যিনি পঞ্চগড় জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। মনিরা পারভীন মূলত প্রভাবশালী শেখ হেলালের আস্থা ভাজন ছিলেন ।
বড় বোনের রাজনৈতিক প্রভাবেই লাবলুর রহমান আনসার ক্যাডার (১৯৯৫ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত আনসার ক্যাডারে ছিলেন) থেকে ২০১৩ সালে প্রশাসন ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত হন এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের পিডি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ব্যাপক নিয়োগ বাণিজ্য করেন । আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, মনিরা পারভীনের মেয়ে তামান্না জ্যোতি গাজীপুরের একটি উপজেলায় ইউএনও হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং ৫ই আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর দেশত্যাগ করেছেন। লাবলুর রহমান ও তার পরিবার আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় এই সিন্ডিকেটটি দীর্ঘসময় ধরে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে দুর্নীতি চালিয়ে গেছে।
সেতু বিভাগে চার বছর ডেপুটি সেক্রেটারি ও জয়েন্ট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেই লাবলুর রহমানের দুর্নীতির ভিত্তি মজবুত হয়। বিশেষ করে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ডিপিডি হিসেবে দুই বছর দায়িত্ব পালনকালে তিনি শত কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করেন, যার ফলে ৪-৫ মাস আগে তার নামে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা দায়ের করা হয় এবং সেতু মন্ত্রণালয় তাকে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করে। তার বোনের আওয়ামী সংশ্লিষ্টতার সুবাদে শেখ হেলালকে দিয়ে সুপারিশ করিয়ে ২০২৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি সিভিল এভিয়েশনে বদলি হন লাবলুর রহমান।এরপর থেকে দেড় বছর মেম্বার ফাইন্যান্স থাকাকালীন তিনি প্রতিটি ব্যাংক থেকে ১% কমিশন নিয়ে সরকারি ফান্ডের এফডিআর দিতেন। এছাড়াও বিভিন্ন ব্যাংক থেকে যেসকল নারী কর্মকর্তারা ফান্ডের জন্য আসছেন তাদের কুপ্রস্তাব দেওয়ার মতো অনৈতিক আচরণের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে।
লাবলুর রহমান কাস্টমসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সহায়তায় স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের সাথে জড়িত বলেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ২০২০ সালে ঢাকা কাস্টমস হাউসের তৎকালীন কমিশনার এবং বর্তমানে এনবিআর সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন ও কাস্টমস সদস্য বেলাল চৌধুরীর সহযোগিতায় তিনি এই কর্মকাণ্ড শুরু করেন এবং এখনও এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছেন বলে জানা গেছে। তৎকালীন এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম, ডিবি প্রধান কৃষ্ণ পদ রায় এবং ডিএমপির বিপ্লব কুমার সরকারের মতো উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা ভোগ করে এসেছেন। এছাড়া তিনি আওয়ামী লীগ শাসনামলে ১৫তম বিসিএস ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে সাত বছর দায়িত্ব পালন করেন।
লাবলুর রহমানের পারিবারিক জীবন অত্যন্ত বিলাসবহুল এবং অর্থ ব্যয়ে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয় না। তার বড় মেয়ে মালয়েশিয়ায় পড়াশোনা করেন এবং প্রতি মাসে ২০-২৫ লক্ষ টাকা খরচ করেন, যা লাবলুর রহমান অবৈধভাবে হুন্ডির মাধ্যমে পাঠিয়ে থাকেন। তার ছোট মেয়ে রাজধানীর DPS STS School ঢাকাতে পড়াশোনা করেন। যে স্কুলের মাসিক বেতন লক্ষাধিক টাকার উপরে।
তার পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত রেডিসন, শেরাটন এবং ঢাকার বিভিন্ন নামী ক্লাবে মদ্যপান ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনে অভ্যস্ত এবং তারা প্রায়ই বিমান বাংলাদেশের বিজনেস ক্লাসে যাতায়াত করেন। লাবলুর রহমান নিজেও গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন ক্লাবে অবস্থান করে লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করেন এবং তার বর্তমান স্ত্রীর সাথে (যাকে তিনি একবার ডিভোর্স দিলেও এখন বিয়ে না করে একসাথে থাকছেন) তার অনৈতিক জীবনযাপনের চিত্র ফুটে উঠেছে।
বর্তমানে বেবিচকের মেম্বার অ্যাডমিন হিসেবে লাবলুর রহমান বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন, যার একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো প্রকৌশলী সায়েমের বদলি নিয়ে আর্থিক লেনদেনের ঘটনা। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে তিনি বর্তমানে রাজধানীর উত্তরায় ৪টি, বসুন্ধরায় ২টি, গুলশানে ১টি এবং বনানীতে ১টি সহ মোট ৮টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালিক এবং তার ব্যবহারের জন্য ৩টি দামী গাড়ি রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চেয়ে, লাবলুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে তার ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে খুদেবার্তা পাঠালেও লাবলুর রহমান কোন সাড়া প্রদান করেননি।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার অফিসের একাধিক কর্মকর্তা জানান, দেশ ও জাতির মঙ্গলের জন্য এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তি প্রদান করা জরুরি।