
শাকিল আহম্মেদ বরিশাল
বরিশাল সরকারি বিএম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের দুই প্রিয় শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক বিলাস মল্লিক ও প্রভাষক মুক্তা বেগমের বিদেশে উচ্চশিক্ষার্থে গমনের প্রাক্কালে আয়োজিত বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠান এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি করে। কলেজের পরীক্ষা ভবনে সকাল ১১টায় এই আয়োজন শুরু হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা।
অনুষ্ঠানটি প্রভাশক নুসরাত বেগমের সঞ্চালনায় শুরুতেই কোরআান তেলাওয়াত ও কিতাপাঠ এবং দুই শিক্ষককে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়। সহকারী অধ্যাপক বিলাস মল্লিককে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান মাহফুজা বেগম, এবং প্রভাষক মুক্তা বেগমকে শুভেচ্ছা জানান শিক্ষক মাইনুল ইসলাম। এছাড়াও বিভাগের প্রধান ড. মো. ইব্রাহীম খলিল স্যারকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান মাহফুজা ম্যাম।
শুভেচনা বক্তব্যে আবেগ ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে।
৩৫তম ব্যাচের ছাত্রী বৈশাখী বলেন, “দুই শিক্ষক আমাদের পাঠদানে যেমন ছিলেন নিষ্ঠাবান, তেমনি মানবিকতায়ও ছিলেন অনন্য। আজ বিদায়ের ক্ষণে আমার চোখ অশ্রুসিক্ত।”
৩৪তম ব্যাচের তামিম এবং ইমন বলেন, “আজকের দিনটি আনন্দের হলেও, ভেতরে লুকিয়ে আছে এক অপূরণীয় শূন্যতা। যদি কখনো আমাদের কোনো আচরণে কষ্ট পেয়ে থাকেন, তবে ক্ষমা করে দেবেন।”
৩২তম ব্যাচের শ্রান্তি বলেন, “এ বিদায় নয়, এটি নতুন পথচলা। তবে আমাদের হৃদয়ে আপনি আদর্শ হিসেবে থাকবেন।”
৩১তম ব্যাচের রফিকুল বলেন, “স্যার ও ম্যাডামের ক্লাস কখনোই মিস করতাম না। তাদের সাফল্য আমাদেরও গর্বিত করে।”
২৬তম ব্যাচের নুরুল আমিন স্মরণ করেন প্রয়াত শিক্ষকদের এবং বলেন, “আমাদের সমাজ গড়তে যে দৃষ্টিভঙ্গি দরকার, তা বিলাস স্যারের কাছেই শিখেছি।”
২৮তম ব্যাচের তোহা বলেন, “মুক্তা ম্যাম ও বিলাস স্যার আমাদের অনুপ্রেরণা, তারা রোল মডেল হয়ে থাকবেন।”
২৪তম ব্যাচের শাহাদাতও স্মৃতিচারণ করেন আবেগভরা ভাষায়।
শিক্ষক মাইনুল ইসলাম বলেন, “আলো আর অন্ধকারের এই জীবনে, বিলাস মল্লিক ও মুক্তা বেগম ছিলেন আমাদের জীবনের আলোকবর্তিকা। তারা ছিলেন বিএম কলেজের দুটি উজ্জ্বল নক্ষত্র।”
মাহফুজা আক্তার বলেন, “মুক্তা বেগম আমার বিভাগের ছোট বোন। তার জীবনদর্শন, ইতিবাচক মনোভাব এবং মেধা তাকে এই জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। আমরা গর্বিত।”
নিজের বক্তব্যে প্রভাষক মুক্তা বেগম জানান, “আমার এই সাফল্য সহজ ছিল না। অষ্টম শ্রেণিতে থাকতেই আমার বিয়ের কথা চলছিল। কিন্তু আমার মা ছিলেন আমার ঢাল। আমি সাইক্লোন সেন্টার থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত এসেছি নিজের চেষ্টায়। এক শিক্ষক বলেছিলেন, ‘সবাই পারলে তুমি কেন পারবে না?’ সেই কথাই আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। আমি জেন্ডার ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কাজ করতে চেয়েছি সবসময়। বিদায়ের আগে যদি কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকি, ক্ষমা করে দেবেন। তোমরা সবাই দেশের গর্ব হও।”
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএম কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. শেখ মো. তাজুল ইসলাম বলেন, “এই বিদায়ী অনুষ্ঠান তখনই সফল হবে যখন তোমরা স্যারদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেরাও উচ্চশিক্ষা অর্জনের স্বপ্ন দেখবে। আজকের এই শুভক্ষণ আমাদের গর্বের, কারণ আমাদের শিক্ষকরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছেন।”
সবশেষে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান বলেন, “এই আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু আমাদের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র—বিলাস মল্লিক ও মুক্তা বেগম। তারা যাচ্ছেন স্বপ্নপূরণ করতে, যা আমাদের গর্ব। তবে তাদের অভাবও আমরা তীব্রভাবে অনুভব করব। আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা শুধু সার্টিফিকেট নয়, মানুষ হয়ে গড়ে উঠুক।”
এই বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কান্না, স্মৃতি আর শুভকামনায় পরিপূর্ণ এক অধ্যায় রচিত হলো বিএম কলেজের ইতিহাসে।